মাতৃভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান চর্চা (Teaching through Mother Language)

” অন্য দেশে গেলে একটা জিনিস চোখে পড়ে। সব দেশে চেষ্টা চলছে মাতৃভাষার মাধ্যমে,যে ভাষা সবাই বোঝে তার উপর বুনিয়াদ করে, শিক্ষার ব্যবস্থা করবার। ”

– বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু

ভূমিকা

মাতৃভাষার মাধ্যম ব‍্যতীত নেই শিক্ষা সম্পূর্ণতা। শিক্ষার সার্বজনীনতা সম্ভব কেবলমাত্র মাতৃভাষার মাধ্যমেই। মাতৃভাষা, যাতে শিশুর মুখে প্রথম বুলি ফোটে, তা সকলের কাছে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মত সহজ ও স্বাভাবিক। সেই ভাষায় যে কোন বিষয়ে শিক্ষাদান এর সফলতা অনিবার্য। শিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষা তাই মাতৃদুগ্ধের মতো পুষ্টিকর । দুঃখের বিষয়, তাকে পরিহার করে আমরা ইংরেজি ভাষাকেই বিজ্ঞান ,শিক্ষা, সঞ্চারিণী ভাষা সরস্বতীর সিংহাসনে অভিষিক্ত করেছি ।

ইংরেজি ভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষার নিষ্ফলতা

রবীন্দ্রনাথ বলেন, এক তো, ইংরেজি ভাষাটা অতিমাত্রায় বিজাতীয় ভাষা। শব্দবিন্যাস পদবিন্যাস সম্বন্ধে আমাদের ভাষার সহিত তাহার কোন প্রকার মিল নেই। সুতরাং ধারণা জন্মিবার পূর্বেই মুখস্ত আরম্ভ করিতে হয় । তাহাতে না চিবাইয়া গিলিয়া খাইবার ফল হয়। অর্থাৎ, আমাদের স্কুলে কলেজে ইংরেজি ভাষা বাহিনী বিজ্ঞান শিক্ষা হয়েছে মুখস্ত ভরসা।

মাতৃ ভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষার সফলতা

বিজ্ঞানে বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের একমাত্র অপরাধ ,কেন তারা বাঙালি পিতা মাতার কোলে জন্মগ্রহণ করেছে। একজন ফরাসি কিংবা জার্মান কিংবা জাপানি ছাত্রকে তো ইংরেজি ভাষায় বিজ্ঞান গলাধঃকরণ করতে হয় না, তবুও তারা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কিরূপে এতোখানি প্রাগসর ? অথচ বাংলা ভাষার শব্দ নির্মাণ ক্ষমতা যেকোনো ভাষার চেয়ে অনেক বেশি । কাজেই, বাংলা ভাষায় স্কুলে কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষা বিতরিত হলে আমাদের শিক্ষার ভোজে বিপুল অপচয় অবরুদ্ধ হবে।

ইংরেজ আমলে বিজ্ঞান শিক্ষা ও উপেক্ষিতা মাতৃ ভাষা

পরাধীন ভারতে বিদেশি শাসকের এদেশে তাদের বাণিজ্যিক প্রশাসনিক এবং এদেশের মনোবিজয়ের প্রয়োজনে পাশ্চাত্য ধাঁচের শিক্ষা প্রণালীর প্রচলন করে। তার ফলে, সরকার স্থাপিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অচিরেই আত্মপ্রকাশ করলো কেরানী গড়ার কারখানা রুপে। চাকরির প্রলোভনে বাঙালি ছাত্ররা ইংরেজির মোড়কে যে পশ্চিমে শিক্ষা গলাধঃকরণ করেছে তার অধিকাংশই থেকেছে গ্রন্থবন্দী। যেটুকু কাজে লেগেছে, তাতে কেরানি বা প্রশাসনিক বিভাগের কর্মচারী হওয়া যায় তাতে সম্ভব নয় মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশ বা প্রতিভার পরিপূর্ণ অভিব্যক্তি। বহু আবেদন বিনোদন ও আন্দোলনের পর যখন এদেশে বিজ্ঞান ইঞ্জিনিয়ারিং ,চিকিৎসা- বিদ্যা ও প্রযুক্তি -বিদ্যার কুণ্ঠিত প্রচলন হল ,তখন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ইংরেজি ভাষায় লৌহ পেটিকায় রাখা হল বন্দী। কুণ্ঠিত আঙ্গুলের ফাঁক গলে যেটুকু বিজাতীয় ইংরেজি প্রবাহিত শিক্ষা আমাদের দেশের কতিপয় তরুণের মস্তিষ্কে প্রবাহিত হয়ে এল তাতে বিদ্যার পরিমাণ ছিল যৎ সামান্য।

বাংলায় বিজ্ঞান শিক্ষার বর্তমান অবস্থা : প্রতিকূল যুক্তি মালা

স্বাধীনতা লাভের সুদীর্ঘকাল পরে ও বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও প্রযুক্তি বিদ্যার ক্ষেত্রে মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে ইংরেজি মাধ্যম কেই বহাল রাখা হয়েছে। একদা রবীন্দ্রনাথ, স্যার আশুতোষ প্রমুখ বাংলা ভাষা প্রেমি মনীষীগণের প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম শ্রেণীতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পঠন পাঠন শুরু হয়। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পরে বাংলা ভাষার মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীকে সাম্মানিক এবং উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। সাম্মানিক ও উচ্চতম স্তরে ইংরেজি মাধ্যমের স্থায়িত্ব রক্ষার অনুকূলে যেসব যুক্তি প্রদর্শিত হয়, সেগুলি হল :এক- বিজ্ঞান বিষয়ে বাংলার প্রকাশ ক্ষমতা অত্যন্ত দীন,দুই- বাংলায় বিজ্ঞান বিষয় এর উপযুক্ত পারিভাষিক শব্দের অভাব তিন- বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার উপযুক্ত ঐতিহ্যের অভাব, চার- বাংলা ভাষার প্রচার পরিধি সীমিত, অথচ বিজ্ঞান একটি আন্তর্জাতিক বিষয় — কাজেই, তার পঠন-পাঠন আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজী মাধ্যমেই অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাভাষা বাহিনী বিজ্ঞান শিক্ষার কোনো ভবিষ্যত নেই ।

বিজ্ঞান চর্চায় মাতৃভাষার বিপুল সম্ভাবনা

যুক্তি সমূহের জবাবে বলা যায়: এক- বিজ্ঞান বিষয়ে বাংলার প্রকাশ ক্ষমতার সীমা সুদূর প্রসারিত এবং বহু সম্ভাবনাময় ।অক্ষয় কুমার দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, জগদীশচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ,জগদানন্দ রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ,মেঘনাদ সাহা প্রমুখ বিজ্ঞানবিদগণের বিভিন্ন রচনায় তা প্রমাণিত হয়েছে ।বাংলা ভাষার শব্দ গঠন ক্ষমতা ও অসীম। দুই- বিজ্ঞান বিষয়ে বহু বাংলা পারিভাষিক শব্দ সংকলিত হয়েছে। যেসব ইংরেজি শব্দের এবং ফর্মুলা বা সূত্রের বাংলা পারিভাষিক শব্দ এখনো নির্মিত ও সংকলিত হয়নি বাংলায় অনায়াসেই সেই ইংরেজি শব্দ গুলি ব্যবহৃত হতে পারে । কালক্রমে সেগুলির বাংলা প্রতিশব্দ নির্মিত হবে ।নতুবা, ইংরেজি পারিভাষিক শব্দই থাকবে প্রচলিত। বিজ্ঞানসম্মত অনুশীলনের ফলে বাংলায়ও কালক্রমে গড়ে উঠবে সেই বাংলা ঐতিহ্য ধারা। চার -ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা এবং তার তুলনায় বাংলা ভাষার প্রচার পরিধি সংকীর্ণ ।কেবল এই যুক্তিতে লক্ষ লক্ষ বাংলা ভাষা-ভাষী ছাত্রছাত্রীকে বিজ্ঞান শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা অযৌক্তিক।

উপসংহার

বিজ্ঞানকে গণমুখী করতে হলে বিজ্ঞান বিষয়ে মাতৃভাষায় গ্রন্থ রচনা প্রয়োজন । কিন্তু কারা সেই গ্রন্থ রচনা করবেন? আগামীকালের যাঁরা বিজ্ঞানী ,গবেষক কিংবা বিজ্ঞানের যাঁরা শিক্ষক অধ্যাপক, তাঁরাই। কাজেই ,আজ বিজ্ঞান শিক্ষাকে যদি জনপ্রিয়, সার্বজনীন ও আত্মস্থ করতে হয়, তবে মাতৃভাষায় হবে বিজ্ঞানের অন্দরমহলে প্রবেশের সুনিশ্চিত চাবিকাঠি। কারণ, মনে রাখতে হবে ,’বাঙালির ছেলে ইংরেজি বিদ্যায় যতই পাকা হোক, তবু শিক্ষা পুরো করবার জন্যে তাকে বাংলা শিখতেই হবে ।

Show Your Love
Print Friendly, PDF & Email

Related Posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
WhatsApp
Twitter
Email
Telegram
Scroll to Top