আন্তর্জাতিক নারী দিবস

ভূমিকা

সনাতন ভারতীয় সমাজে নারীর একটি সশ্রদ্ধ মর্যাদাপূর্ণ স্থান ছিল। আর্য সমাজ মূলত পিতৃতান্ত্রিক হলেও নারী ও পুরুষের সমান অধিকার স্বীকৃত ছিল । তাই আর্য অঙ্গনাদের মধ্যে বিশ্ববারা, ঘোষা, গার্গী, এর মতো বিদুষী ব্রহ্মবাদিনী নারী সুপন্ডিত প্রজ্ঞাবান পুরুষের সমকক্ষতা অর্জন করেছিলেন। অন্যদিকে অনার্য সমাজে মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে যে নারীর ভূমিকাই ছিল প্রধান ও সক্রিয়, তা সর্বজনবিদিত। কিন্তু বৈদিক সমাজে যেদিন থেকে পুরোহিততন্ত্র এর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হল এবং সমগ্র সমাজের চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়াল মনুস্মৃতির অনুশাসন সেদিন থেকেই ভারতীয় নারীর অনগ্রসরতার সূচনা হলো । অবশ্য পৃথিবীর সব দেশেই যাজকতন্ত্রএর প্রাধান্যের ফলে শালীনতা ও আব্রুর নামে প্রতি স্তরে নারীকে শৃঙ্খলিত করা হয়। বিগত কয়েক দশক আগে ব্রিটিশ নারীকে ভিক্টোরীয় পিউরিটানিজম বা রক্ষণশীল শুচিতার আদর্শ মেনে চলতে হতো। ষোড়শ শতকে ইউরোপের নবজাগরণ ঘটলেও সারা বিশ্বে নারী সমাজের সুপ্তি ভঙ্গ ঘটে বিংশ শতাব্দীর সূচনায়। কিন্তু আজ একবিংশ শতাব্দীতে নারী দিবসের শতবর্ষে পদার্পণ করেও কি নারীসমাজ প্রকৃতার্থেই স্বাধীন? তারা কি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নিজেকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও সাম্যের অধিকার লাভে সক্ষম?

মধ্যযুগীয় সমাজে ভারতীয় নারী

উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজ নারীকে জায়া ও জননী রূপে দেখতে অভ্যস্ত ছিল। পরিবারের কেন্দ্রে বিরাজিত থেকে যে নারী সন্তান পালন, পতিসেবা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রতি যথাযথ কর্তব্য সম্পাদন করেন তিনি ছিলেন লক্ষ্মীস্বরূপা। নারীর কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব, ব্যক্তিত্ব, স্বাধীন হৃদয়বৃত্তি থাকা ছিল অপরাধ । ইসলামী প্রভাবে অভিজাত ও নারীরা পর্দাশীল হয়ে উঠেছিলেন । নারীর সামনে ক্রমাগত প্রচার করা হতো সতীত্বের মহিমা, পতিব্রত ধর্মের আদর্শ। ইংরেজ শাসনের সূচনা পর্বেও সতীদাহ, সহমরণ ইত্যাদি পৈশাচিক প্রথার প্রচলন ছিল। পুরুষেরা কিন্তু সমাজপতির আসনে অধিষ্ঠিত থেকে যথেচ্ছ ভোগপরায়ন জীবন যাপন করত। নারী-পুরুষের এই বৈষম্যের চিত্র উনিশ শতকের সৃজ্জমান নাগরিক সমাজে ও বজায় ছিল । মুসলিম নারীসমাজ তো পূর্বাপর শরীয়তী অনুশাসন মেনে চলে আসছেন। এই স্থলে প্রতিবিধান কারক রূপে বেগম রোকেয়া উল্লেখযোগ্য ।

উনিশ শতকের নবজাগরণ ও ভারতীয় নারী

ভারত পথিক রাজা রামমোহন রায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর উদ্যোগে এদেশের স্ত্রী শিক্ষা প্রসারের প্রথম পর্বে পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। এই সময়ে নারী প্রগতির প্রয়াস নানা ধরনের স্ববিরোধে আক্রান্ত হচ্ছিল। যুগসন্ধির কবি ঈশ্বর গুপ্ত মানবতাবাদি হয়েও উচ্চশিক্ষার বিরোধী ছিলেন। অবশেষে ব্রাহ্মধর্ম ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িকে কেন্দ্র করে নারী স্বাধীনতার সূর্য উদয় হয়। ব্রাম্ভিকরা সমাজের নিন্দাবাদ অগ্রাহ্য করে বহির্জগতে বেরিয়ে আসেন । ঠাকুরবাড়ির জ্ঞানদানন্দিনী দেবী এবং চন্দ্রমুখি ও কাদম্বিনী বসু প্রভৃতিকে বলা হয় ভারতীয় নারী প্রগতির ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। এদের প্রভাব সমগ্র ভারতের নারী সমাজে ছড়িয়ে আছে।

আধুনিক যুগে ভারতীয় নারী

দুটি বিশ্বযুদ্ধের পরিণামই মূল্যবোধ সমাজের পুরনো ধ্যান-ধারণা কে বিধ্বস্ত করে দেয়। উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নারী হয়ে উঠল পুরুষের কর্ম সঙ্গিনী। সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারী নানা পেশায় নিযুক্ত হতে থাকলো। শিক্ষায়তনে, গবেষণাগারে, অফিস-আদালতে, হাসপাতালে, এমনকি প্রতিরক্ষা বিভাগেও ভারতীয় নারী কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন । এসব তারা নিজের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। যার যেমন যোগ্যতা নারী তেমনই বৃত্তিতে নিযুক্ত রয়েছেন।

নারী দিবসের সার্থকতা ও আজকের সমাজে নারীর মর্যাদা

নারী দিবস হিসেবে পালন করা হয় 8 ই মার্চ দিনটিকে। আজ নারী দিবস শতবর্ষে পা রেখেছে । শতবর্ষ অতিক্রমের পরেও নারী দিবস কিংবা নারীর স্বাধীনতা অথবা এম্পাওয়ার্মেন্ট অফ উইমেন (empowerment of women) নামক বিষয়গুলির আমাদের সমাজে ভূমিকা কতটুকু? কোন সংখ্যাতত্ত্ব অথবা তাত্ত্বিক বিচারে না গিয়ে এক কথাতেই উত্তরটা দেওয়া যেতে পারে, খুব একটা নয়। ৮ ই মার্চ, নারী দিবস নামক দিনটি তার রূপ-রস-গন্ধ ও জ্বালাময়ী বক্তৃতায় পরেও নারী চেতনা ও মননে খুব একটা পরিবর্তন আনতে পারেনি । আসল কথা হলো নারীদের সম্পর্কে ভারতীয় পুরুষ তথা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি খুব একটা পাল্টায়নি । একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞাননির্ভর অত্যাধুনিক যুগে বাস করেও নারীর উপর পুরুষ কি অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে না? তারা কি আজও পুরুষশাসিত সমাজের লালসা ও লোভের শিকার হচ্ছে না?

দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতেই অধুনা সমাজের প্রায়সই সংঘটিত ঘটনাগুলি এই ধারণার সত্যতা প্রমাণ করে । বধূনির্যাতন, বধূহত্যা, মানসিক নির্যাতন করে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়া, ইত্যাদি ঘটনার সংখ্যাধিক্য ভারতীয় সমাজকে প্রতিদিন কলঙ্কিত করেই চলেছে । পণপ্রথা আজও ভারতীয় সমাজে জাঁকিয়ে বসে আমাদের আধুনিকতা ও বিজ্ঞানমনস্কতাকে বিদ্রুপ করেছে। কন্যা সন্তান পরিবারের অবাঞ্চিত বলে কন্যাভ্রূণ হত্যার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দরিদ্র পরিবারের শ্রমজীবী শিশুকন্যা শুধুই পুতুল খেলার স্বপ্ন দেখে । কর্মক্ষেত্রেও মহিলাদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করা হয়। স্কুল-কলেজের কিশোরী যুবতী মেয়েদের ইভটিজিং এর বিরক্তি সহ্য করতে হয়। এসব অশোভন, অশালীন আচরণ ও বঞ্চনা শুধু আধুনিক ভারতীয় সমাজের নারীদের নয়, বিশ্বের সব দেশের সভ্য মানুষের সমাজে নারীদের সহ্য করতে হয়।

তাহলে আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সার্থকতা কোথায়? নারীর সঙ্গে পুরুষের সমান অধিকার আন্দোলনের অর্থ কি ? এখনো পৃথিবীতে সব ক্ষেত্রেই পুরুষই তার অধিকার কায়েম করে চলেছে। কি প্রাপ্তি শতবর্ষে নারী দিবস বা নারী দিবসের শতবর্ষে? কিছু গতে বাঁধা আলোচনা সভা, সেমিনার। বড়ো বড়ো বক্তিতা সভায় গন্যমান্য ব্যাক্তিদের বক্তব্য। টেলিভিশন চ্যানেলে চ্যানেলে ঝাঁ-চকচকে হোলটারনেট পরিহিতাদের ক্লোজআপ এবং বাণীসমৃদ্ধতুমুল উদযাপন। শুধুমাত্র লোক দেখানো কিছু বাহ্যিক আচার। প্রকৃতার্থে এখনো আমরা সম্পূর্ণ রুপে নারী দিবস এর প্রকৃত অর্থ ও কার্যকারিতা আনতে সক্ষম হতে পারিনি বললেই চলে।

নারীবাদী আন্দোলনের উদ্ভব ও বিকাশ

পুরস্কার বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ জানাতেই পাশ্চাত্যের নারী সমাজের ক্ষোভ ও নারীবাদী আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করে । বলা যায়, ষাটের দশকে পশ্চিমের দেশগুলোতে নারীবাদী আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে । মেয়েরা পুরুষের বশ্যতা অস্বীকার করে স্বতন্ত্র জীবন-যাপনে প্রতিশ্রুত হন। বহু বিতর্কিত নারীবাদী নেত্রী, সাইমন দ্য বোভোয়ার দ্য সেকেন্ড সেক্স (The Second Sex) বইতে নারী বিদ্রোহের বিস্ফোরণ ঘটান। সব আন্দোলনেই যা হয়ে থাকে, অত্যুৎসাহের ফলে নারীরা মূল উদ্দেশ্য থেকে বিস্মৃত হলেন। তারা নারীর সামাজিক দায়িত্ব ভুলে গিয়ে পুরুষ বিদ্বেষী বিক্ষোভ প্রদর্শনে মেতে উঠলেন। ফলে কিছুকাল পরেই এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়লো । তবে নারীবাদী আন্দোলন সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল । উইমেন লিভ এর লক্ষ্য অনেকটাই বাস্তবায়িত হয়েছে যখন রাষ্ট্রসংঘ ১৯৭৫ সালকে “আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ” হিসেবে ঘোষণা করল। রাষ্ট্রসংঘ প্রত্যেকটি সদস্যদ দেশকে নারীর মর্যাদা, সামাজিক অধিকার রক্ষায় বিশেষ কতগুলি কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানায়। এরপর ১৯৯০ সালকে আন্তর্জাতিক নারী কল্যাণে উৎসর্গ করা হয়। এসব থেকে বোঝা যায় নারীর সামাজিক অধিকার সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাসী সচেতন হয়ে উঠেছেন।

ভারতে নারীবাদী আন্দোলন

ষাটের দশকের শেষদিকে ভারতীয় নারীবাদী আন্দোলনের সক্রিয়তা দেখা যায়। ভারতের এই আন্দোলন উচ্চ শিক্ষিত সমাজের প্রতিষ্ঠাতা নেত্রীদের দ্বারা পরিচালিত এবং প্রচারিত। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত দুঃসাহসী প্রবন্ধ, কবিতাতেই সীমাবদ্ধ থাকলেও তাদের আন্তরিকতায় সন্দেহ জাগতেই পারে। দু-একজন তসলিমা নাসরিন, মৈত্রী চট্টোপাধ্যায়, মল্লিকা সেনগুপ্ত কিংবা মালয়ালম লেখিকা কমলা দাস এর আত্মজীবনীর বুদ্ধিজীবী মহল এ বৈঠকে আলোচনার বিষয় হতে পারে, কিন্তু ভারতের সমগ্র নারীসমাজের চেতনা বৃদ্ধি পায়নি। গ্রামাঞ্চলের নারীসমাজ যথারীতি অজ্ঞতার অন্ধকার এ বঞ্চিত, শোষিত জীবন-যাপন করে চলেছেন। নারী প্রগতি শহরের মুষ্টিমেয় নারীদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে থাকলে ভারতীয় নারী সমাজ তিমির বাসিনি হয়েই থাকবেন।

উপসংহার

ভারতে তো নারীকে প্রকৃতি রুপিনী শক্তির স্বীকৃতি দিয়ে পুরুষের জীবনে তার অপরিহার্যতার মূল্যকে বহু পূর্বেই মেনে নেয়া হয়েছে। কিন্তু শাস্ত্রীয় বচনের স্বীকৃতি এবং পরিবর্তমান সমাজ প্রেক্ষিতে নারীর মূল্যায়ন, দুটো এক কথা নয়। নারী ধরিত্রীর মত সর্বংসহা হয়ে থাকবে আর পুরুষ যথেচ্ছ আধিপত্য চালিয়ে যাবে, এই ধারনার উচ্ছেদ করতেই হবে। এজন্য তথাকথিত নারীবাদী আন্দোলন যথেষ্ট নয়, নারী-পুরুষ উভয়েই মিলিত উদ্যোগে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা চাই। নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার অধিকার নিতে হবে স্বহস্তে। নারীকে শিক্ষা, আত্মনির্ভরতা, আত্মমর্যাদা বোধ জাগ্রত হয়ে উঠতে হবে। পুরুষ কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তবেই প্রকৃতার্থে সার্থক হয়ে উঠবে বিশ্ব নারী দিবসের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

Show Your Love
Print Friendly, PDF & Email

Related Posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
WhatsApp
Twitter
Email
Telegram
Scroll to Top