বাংলার মেলা ও একটি স্থানীয় উৎসব (Bengals Fair and a Local Festival)

“উৎসব প্রাঙ্গণের মুক্ত অঙ্গনে সকল গ্রামবাসীর মনের উচ্চসিত মিলনস্থল হইল মেলা”।। – রবীন্দ্রনাথ

ভূমিকা:-

‘মেলার আক্ষরিক অর্থ মিলন’। মেলা পরস্পরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও ভাবসম্মিলন এর একটি মানবিক সংযোগ সেতু। প্রাচীনকাল থেকে ভারতে মেলার গুরুত্ব তাই অসীম। কোন দেব মন্দির প্রাঙ্গণে কিংবা নদী ও সমুদ্রোপকূলে কিংবা গ্রামে কোন বিশিষ্ট স্থানে কোন উৎসব উপলক্ষে সমবেত হয় অগণিত মানুষ। তাই মেলা নামে খ্যাত। মেলা তাই মিলন মেলা।

মেলার তাৎপর্য দুটি মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক:-

মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক, দুটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক মেলার আছে । মনস্তাত্ত্বিক দিক কি হলো: ভাবের আদান-প্রদান, অর্থনৈতিক দিকটি হল : পণ্য বিকিকিনি। সারাবছর আপন আপন সীমা বেষ্টনীর মধ্যে বাস করার ফলে তার মনের রাজ্যে আসে ক্লান্তি ও সঙ্কীর্ণতা। সংকীর্ণ স্বরচিত কারাগার থেকে বাইরে মানুষের সান্নিধ্যে দাঁড়াবার প্রয়োজন অনুভূত হয় একাকিত্বের ক্লান্ত মানুষের অন্তরে। মেলায় অবাধ মেলামেশায় মনের প্রসারতা, পারস্পরিক ভাববিনিময় এবং আর্থিক লেনদেনের মধ্যে গড়ে ওঠে একটি অখণ্ড সামাজিকতা।

পশ্চিমবঙ্গের মেলা:-

মেলার’ মধ্যে যেমন আছে সার্বজনীনতা তেমনি আছে আঞ্চলিক সংস্কৃতির স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি। যুগ যুগ ধরে মেলা কে অবলম্বন করে আঞ্চলিক সংস্কৃতি লাভ করে আত্মপ্রকাশের সুযোগ। তাই গ্রাম জনপদের জীবনে মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। মেলা সঙ্গে লেগে থাকে ধর্মের একটি স্পর্শ। কিন্তু মেলার বড় কথা হলো মানুষের অবাধ মিলন ,পারস্পরিক ভাব বিনিময় এবং ঘনিষ্ঠ সামাজিকতার বিকাশ।

পশ্চিমবঙ্গের রথের মেলা, ঝুলনের মেলা, পৌষ সংক্রান্তির মেলা, চড়কের মেলা, প্রতিবছরই নির্দিষ্ট সময়সূচী অনুষ্ঠানে অনুসারে অনুষ্ঠিত হয়। বারো মাসে তেরো পার্বণের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মাহেশ ও মহিষাদল এর রথের মেলা ,শান্তিপুরের রাসের মেলা, তারকেশ্বরের গাজনের মেলা, শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা, মকর সংক্রান্তির সাগর মেলা, জলপাইগুড়ির জল্পেশ্বরের, চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজার মেলা , কেঁদুলির জয়দেবের মেলা এবং কলকাতার বইমেলা অতি প্রসিদ্ধির জন্যে ভারত বিখ্যাত।

মেলার বৈশিষ্ট্য:-

সাজসজ্জা এবং পরিকল্পনার দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত মেলারই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রায় এক। কোথাও মনোহারী দোকান, কোথাও খেলনা ও মাটির পুতুলের দোকান ,কোথাও তেলে ভাজা পাপড় ঘুগনির দোকান, কোথাও হাঁড়ি কুলো কাস্তে কাটারির দোকান ,কোথাও জামা কাপড়ের দোকান, কোথাও মিষ্টির দোকান, চায়ের দোকান , চায়ের দোকান , ছবির দোকান, বাঁশির দোকান, কোথাও চুড়ি-ফিতে কাঁটার দোকান, কোথাও সস্তা বইয়ের দোকান ,কোথাও টুপি-পাগড়ি ছাতার দোকান ,আবার কোথাও নাগরদোলা, ভিড় সবখানেই। কোথাও থাকে পুণ্যস্নানের ব্যবস্থা, কোথাও থাকে পূজা দানের ব্যবস্থা, কোথায় থাকে প্রদর্শনীর আয়োজন। এগুলির মধ্যে শোনা যায় আবহমান কালের বাংলার মর্মরিত হৃদস্পন্দন ।

মেলার অভিজ্ঞতা:-

রবীন্দ্র- স্মৃতি বিজড়িত শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা আজ বিশ্ব বিখ্যাত। ৭ ই পৌষ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাধন জীবনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন । সেই উপলক্ষে শান্তিনিকেতনের তিন দিনব্যাপী যে মেলা বসে তা দেখার জন্য সেবার বন্ধুদের সঙ্গে দলবেঁধে বেরিয়ে পড়লাম ।

গ্রাম ছাড়া রাঙামাটির পথ ধরে পিঁপড়ের মতো পিলপিল করে চলেছে বালক- বৃদ্ধ -যুবক-যুবতী সব বয়সের মানুষ । শহরের বাবুরা চলেছে ,চলেছে বিদেশি বিদেশিনীরা, চলেছে গাঁয়ের সাঁওতাল দম্পতিরাও। আর চলেছে বিচিত্র আলখাল্লা গায়ে বাউলেরা হাতে একতারা কোমরে ডুগডুগি। দূর থেকে মেলার কোলাহল ভেসে আসছে, ভেসে আসছে তেলেভাজা- ফুলুরির অতি উপাদেয় গন্ধ । মানুষের পায়ে পায়ে লাল ধুলো উড়ছে।

মেলায় পৌঁছে দেখলাম, লড়াই বেধে গেছে– ঢোল- কাঁসি সহযোগে নেচে-গেয়ে কবির লড়াই। কবির লড়াইআর শুনে বেরিয়ে এসে দেখি মাদলের বোলা আর বাঁশির বিচিত্র সুরে সঙ্গে দল বেঁধে নাচছে গাইছে সাঁওতাল মেয়েরা: ‘বিরসা ভগবান’। লাল পেড়ে সাদা শাড়ি মাথায় হলুদ গাঁদার ফুল।

আসন্ন সন্ধ্যার রঙিন আলোয় রাঙা পথের ধুলোয় রঞ্জিত হয়ে আমরা সেদিন বাড়ি ফিরে এলাম। পরের দিন বিকেলে আমরা আবার গেলাম মেলায়, ছোট ভাইবোনদের জন্যে কিনলাম কতকগুলি মাটির পুতুল। তারপর একটু এগিয়ে দেখলাম, যাত্রার আসর বসে গেছে। যাত্রা শুনে আমরা খেলাম আলুর চপ। তারপর দেখলাম, বিরাট শামিয়ানার নিচে বিচিত্র পোশাকের বাউল ঠাকুর হাতে একতারা এবং কোমরের ডুগডুগি নিয়ে গাইছেন নেচে নেচে ‘ধর্ম -মাছ ধরবো বলে নামলাম বিলে/ কাদা মাখাই সার হল’। বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি বসে শুনছেন তাঁর গান। আমরাও বসে গেলাম। আখড়া ভাঙলো অনেক রাতে।

উপসংহার:-

মেলা দেখে ফিরে এলাম বাড়ি। মনের মনিকোঠায় অক্ষয় হয়ে রইল শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলার অমূল্য স্মৃতি। মেলায় দুষ্টু লোকেরা ও যায় কুমতলব নিয়ে। আমার জনৈক বন্ধুর পকেটে ছিলো কিছু পয়সা। ফেরার পথে দেখা গেল, ওর পকেট টা পকেট মারে কখন নিঃশব্দে কেটে নিয়ে গেছে। মেলার সেই স্মৃতিটা ও স্মরণীয় হয়ে রইলো আমাদের মনের মনিকোঠায়।



সমাপ্ত


অনুরূপ প্রবন্ধ (Similar Essay)

  • একটি মেলার বর্ণনা রচনা
  • মেলার প্রয়োজনীয়তা
  • পশ্চিমবঙ্গের মেলা
  • একটি মেলার অভিজ্ঞতা রচনা

আরো পড়ুন

Related Posts

বাংলার উৎসব (Festival of Bengal)

“প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দিন একাকী কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on email
Email
Share on telegram
Telegram
error: Content is protected !!
Scroll to Top