বৈচিত্রময় ভারত (Diverse India)

ভূমিকা:-

ভারত এক বৈচিত্র্যময় দেশ। এই দেশের অপার্থিব সৌন্দর্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ পোশাক ভাষা পরিচ্ছদের বৈচিত্র এক ঐতিহ্যশালী দেশে পরিণত করেছে। তাইতো ঐতিহাসিকরা একে Epitome of the World’ বলেছেন। তবে ভারতের এই যাবতীয় বৈচিত্র মূলক উপাদানের মধ্যে ঐক্যের ক্ষীণস্রোতটিও প্রবহমান। তাইতো ভারতে এসেছে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য। যেগুলি হলো এরূপ –

ভৌগলিক বৈচিত্রের ঐক্য:-

ভৌগলিক বৈচিত্রের রূপসজ্জায় সজ্জিত হয়েছে ভারত ভূমি। সেজন্য ভারতের মানচিত্রে দেখা যায় উত্তরের উত্তুঙ্গ হিমালয় পর্বতমালা বা পশ্চিমে মরুভূমির মধ্যে সমভূমি। তাছাড়া মালভূমি ও উপকূল ভারতের মধ্যে ভৌগোলিক বৈচিত্র এনেছে। তবে বহু প্রাচীনকাল হতেই হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূভাগ ভারত নামে পরিচিত। হিন্দু আচমন মন্ত্রে গঙ্গা, গোয়া, কাবেরী যমুনার নাম একত্রে উচ্চারিত হয়। তাছাড়া বিষ্ণুপুরাণ ও মনুসংহিতায় সর্বত্রই আসমুদ্র হিমাচল মাত্র আর ভারত ভূমির নামই আছে। এভাবে এসেছে ভৌগলিক বৈচিত্র ঐক্য |

জাতিগত বৈচিত্রে ঐক্য:-

ঐতিহাসিক গীরিজা শংকর গুহ ভারতীয় জনগোষ্ঠীকে (১) নেগ্রিটো , (২) নর্ডিক , (৩) প্রোট অস্ট্রোলয়েড , (৪)মোঙ্গলয়েড ,(৫)মেডিটেরিয়ান , (৬)ব্রাকিসিফেলাম , এই ৬ ভাগে ভাগ করেছেন। তবে তাদের সকলেই জাতীয়ত্ব হলো ভারতীয় এভাবে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্যবোধ রচিত হয়েছে।

ভাষাগত বৈচিত্রের ঐক্য:-

ভারতে প্রায়১৪ টি স্বীকৃত ভাষা ২২৫ টির মত আঞ্চলিক ভাষা ও ৬০০ টির মত উপভাষা বিদ্যমান। তবুও এসব ভাষার মধ্যে উত্তরের যাবতীয় ভাষার জননী হল সংস্কৃত ভাষা ও দক্ষিণী ভাষাসমূহের উৎস হল দ্রাবিড় এভাবে দ্রাবিড় ও সংস্কৃত ভাষা এনেছে ভাষাগত ঐক্যবোধ।

রাজনৈতিক বৈচিত্রে ঐক্য:-

সেই প্রাচীনকাল হতে মধ্য হয়ে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বহুবার ভারতের নানা স্থানে রাজ্য সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। প্রাচীনকালে আর্যাবর্তে ও দাক্ষিণাত্যে পৃথক পৃথক সাম্রাজ্যের বিস্তার হয়েছিল। এছাড়া সুলতানি যুগে আবার দাক্ষিণাত্য ও পূর্বে বাংলায় গড়ে উঠেছিল হিন্দু শাসন। আবার ইংরেজ আমলে ও মারাঠা, নিজাম ও শিখরা স্বতন্ত্র সাম্রাজ্যঃ টিকিয়ে রেখেছিল। তবে এসব রাজনৈতিক বৈচিত্রের মধ্যেও বহুবার সমন্বয় সাধন করার জন্য রাজারা ঐবরাট, সম্রাট উপাধি নিয়ে সর্ব ভারতে অভিযান চালিয়েছেন মুঘল শাসনে বা ইংরেজ আমলে ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য ছিল অনবদ্য। এভাবে রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপিত হয়েছিল।

ধর্মীয় বৈচিত্রের ঐক্য:-

ভারতে আছে শিখ, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, জৈন, ইত্যাদি নানান ধর্মের মানুষ। তবুও ভারতে নানান তীর্থস্থানে পরিভ্রমণ করে পাওয়া যায় ঐক্যের চেতনা। প্রাচীন ও মধ্যযুগের নানক ,শংকরাচার্য, চৈতন্যের মত প্রচারক বা বেদ, গীতা ,উপনিষদে বলা হয়েছে ধর্মীয় সমন্বয়ের বাণী। তাইতো V.Smith বলেছেন

“Pilgrims carried the msssage of India’s unity in Diversity from one end to the other.”

এভাবে ধর্মীয় মেলবন্ধন হয়েছে।

সাংস্কৃতিক ঐক্য:-

বিভিন্ন সময়ে নানান স্থান হতে শক, কুষাণ, পাঠান, মুঘল ,সুলতান, তুর্কি, পারসিক ও সর্বোপরি ইংরেজরা নানান সময়ে ভারতে এসেছে। এদের সংস্কৃতির সমন্বয় ভারতীয় সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে মিশ্র সংস্কৃতি যা ঐক্যের দ্যোতনা দান করে।

সামাজিক ঐক্য:-

বিভিন্ন সমাজে নানা রীতিনীতি ও বিধি বিধান চালু থাকলেও মানুষ যে সামাজিক জীব –এই চেতনা সর্বস্তরে বিদ্যমান। তাইতো ভারতীয়দের মধ্যে স্থান পেয়েছে সামাজিক ঐক্যবদ্ধ।

আদর্শগত ঐক্য:-

‘জনগণ মন অধিনায়ক’, ‘জয় হিন্দ’, ‘বন্দেমাতরম’ এসব ধ্বনিতে ভারতীয়দের আদর্শগত ঐক্যের সুরই প্রতিধ্বনি। এভাবে সকল ভারতবাসী ভারতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাশীল।

ভাবগত ঐক্য:-

দার্শনিক রেঁনা বলেছেন ঐক্য মূলক বিষয়ই হল ভাবগত আসলে বিষ্ণুপুরাণে বলা আছে ভারতের নামানুসারে এই দেশের নাম ভারত বর্ষ ও ভারতবাসী তারই সন্তান। বলা আছে-

“বর্ষং,তৎ ভারত্য নামঃ। ভারতীয় যৎ সন্ততি”

এভাবে সকলে আমরা ভারত ভ্রাতৃত্ব বোধের বন্ধনে আবদ্ধ।

বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য:-

V.Smith বলেছেন-

“India offers unity in diversity”.

আসলেই এই বৈচিত্র ধর্মী ঐক্যই হল ভারতীয় সংস্কৃতির মূলমন্ত্র। “দেবে আর নেবে/ মিলাবে মিলিবে /যাবে না ফিরে” এটাই হল ভারতীয় সংস্কৃতির সারমর্ম। তাইতো. Oxford History of India তে বলা হয়েছে

“Unity transcends the innumerable diversities of blood,colour ,language,dress,manner and seet.”

আর ভারতীয় হিসাবে সেই বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের সুর আমাদের শোণিত ধারায় নিত্যবহ মান।



সমাপ্ত


আরো পড়ুন

Show Your Love
Print Friendly, PDF & Email

Related Posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
WhatsApp
Twitter
Email
Telegram
Scroll to Top