আর্সেনিক দূষণ ও তার প্রতিকার

ভূমিকা

এক বহুল প্রচলিত অন্যতম জীবন সমস্যার নাম আর্সেনিক দূষণ । মানুষের আকাশছোঁয়া লোভের ফল হল এই দূষণ । এই দূষণ এমনই সংক্রামক আকারে ছড়িয়ে পড়ে যে, আর্সেনিক আক্রান্ত নির্দিষ্ট অঞ্চলটির জনগোষ্ঠী ধ্বংস হয়ে যায় । এটি এক ধরনের ধাতু গঠিত দূষণ । এই দূষণের ফলে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে প্রচুর মানুষ মৃত্যুকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয়েছে ।

যেসব দেশগুলিতে আর্সেনিক দূষণের পরিমাণ মারাত্মক আকার নিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো দক্ষিণ এশিয়া । এছাড়াও নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশে এই দূষণের প্রভাব অনেক বেশি।

আর্সেনিকের সূত্রপাত

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর 24 পরগনার বেশকিছু গ্রামের অধিবাসীদের পরীক্ষা করার পর নিশ্চিত হওয়া যায় । এছাড়াও মালদা, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ 24 পরগনা জেলার অনেক জায়গায় আর্সেনিক মিলেছে । পশ্চিমবঙ্গে আর্সেনিক দূষণের ঘটনা প্রথম 1893 সালে নজরে আসে । কলকাতায় স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন এর ডার্মাটোলজি বিভাগের গবেষকরা উত্তর 24 পরগনার অধিবাসীদের শরীরের বেশ কিছু লক্ষন থেকে পরীক্ষা করিয়ে আর্সেনিকের প্রমাণ পান । এরপর ছটি জেলার জল পরীক্ষা করে আর্সেনিকের সন্ধান মেলে । ১৯৮৯ সালে গভীরভাবে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু হয় এবং গবেষণার ফল হল মারাত্মক । পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে তা ভয়াবহ হয়ে ওঠে । বিষক্রিয়া ক্রমশ ছড়াতে থাকে হাওড়া, হুগলি, কলকাতাসহ জেলায় জেলায় । ভাগীরথী নদীর অববাহিকায় আর্সেনিকের সন্ধান মিলেছে।

আর্সেনিক কি?

আর্সেনিক আসলে একটি মৌলিক পদার্থ । আর্সেনিক একটি ধাতুকল্প ( যার মধ্যে ধাতু এবং অধাতু উভয়ের ধর্ম দেখা যায় ) হওয়ায় যৌগের সঙ্গে মিলে থাকে । আর্সেনিক, কোন যৌগ থেকে নিজের শ্রেণীর মৌলের পরমাণু প্রতিস্থাপন করতে পারে । এই জন্য আর্সেনিক মানব শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং বিষক্রিয়া ঘটায়।

আর্সেনিক দূষণের কারণ

ভৌম জলের অবস্থান আর্সেনিক দূষণের অন্যতম কারণ । ভূগর্ভ থেকে উঠে আসা এই ধাতব উপাদানটি ভৌম জলের সঙ্গে মিশে যায় । ফলে পানীয় জল, শস্য, ফলমূল সব জায়গাতেই আর্সেনিকের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং বাস্তু তন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আর্সেনিক দূষণের প্রভাব ও ফলাফল

আর্সেনিক দূষণের ফলে মানব শরীরে নানা রকম বিকৃতি দেখা যায়। যেমন –

  • চর্মরোগ, নখ, চুলের গুরুতর সমস্যা দেখা যায়।
  • ফুসফুসের সমস্যা শুরু হয়।
  • হরমোন ক্ষরণ ব্যাহত ও অনিয়মিত হয়। ফলে শরীরের নানান সমস্যা দেখা যায়।
  • শরীরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অঙ্গের বিকৃতি শুরু হয়।
  • ধীরে ধীরে সারা শরীরে সংক্রমণ ঘটে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
  • শুধু মানুষ নয় মাটিকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকার জীবও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের নানান অসুবিধা শুরু হয়।
  • আর্সেনিক দূষণের মারাত্মক প্রভাব হলো ত্বকের ক্যান্সার।
  • প্রতিকারের উপায়
  • যেসব অঞ্চলে নলকূপ ব্যবহৃত হয়, সেই সব জায়গায় জল পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক।
  • খুব কম দিনের বিরতিতে ঘনঘন জল পরীক্ষা ও তার পরিসংখ্যান রাখতে হবে।
  • ভূগর্ভস্থ জলের পাশাপাশি কোন বিকল্প জলের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
  • বৃষ্টির জল বা বরফ গলা জল ধরে রাখার জন্য দূষণমুক্ত জলাধার প্রস্তুত করতে হবে।
  • পুকুরের তলদেশ পলিথিন দিয়ে ঢেকে, জল ছাড়ার ব্যবস্থা করা জরুরি।
  • ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ফাটানোর ফলে খনিজ আকরিক গুলি এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ি নদীর স্রোতে বা ঝরনায় এসব আকর মিশে যায় ।পাহাড়ে ডিনামাইট ফাটানো বন্ধ করলে, আর্সেনিকের ভৌম জলে মেশার সম্ভাবনা বন্ধ হবে।

পশ্চিমবঙ্গে আর্সেনিক দূষণ এর বর্তমান অবস্থা

আর্সেনিক দূষণ একটি খুব বড় সমস্যা। এই সমস্যা ক্রমবর্ধমান। ধীরে ধীরে গ্রাস করছে গ্রাম, ব্লক, জেলা। বর্তমানে নয়টি জেলা ও জেলার অন্তর্গত ব্লকগুলি আক্রান্ত। সূত্রাকার এ আক্রান্ত জেলা ও ব্লক গুলি দেওয়া হল:

১) মালদা জেলার অন্তর্গত রতুয়া – ১, ২, ইংরেজবাজার, কালিয়াকে – ১, ২, ৩, মানিকচক। ২) মুর্শিদাবাদ জেলার অন্তর্গত রানীনগর – ১, ২, ভগবানগোলা – ১, ডোমকল, নওদা, জলঙ্গি, হরিহরপাড়া, সুতি- ১,২, বেলডাঙ্গা – ১,২, রঘুনাথগঞ্জ – ২, মুর্শিদাবাদ, জিয়াগঞ্জ, ফারাক্কা, সামশেরগঞ্জ, লালগোলা। ৩) নদীয়া জেলার অন্তর্গত শান্তিপুর, তেহট্ট – ১,২, করিমপুর – ১,২, নবদ্বীপ, চাকদহ, হরিণঘাটা, কালিগঞ্জ, নাকাশিপাড়া, হাঁসখালি, কৃষ্ণগঞ্জ, চাপরা, কৃষ্ণনগর – ১,২ রানাঘাট – ১,২। ৪) বর্ধমান জেলা পূর্বস্থলী – ১,২ । ৫) হুগলি জেলার বলাগর। ৬) হাওড়া উলুবেড়িয়া – ২, শ্যামপুর – ২। ৭) উত্তর 24 পরগনার হাবরা – ১,২, বারাসাত – ২, দেগঙ্গা, বসিরহাট – ১,২, ব্যারাকপুর – ১,২, সন্দেশখালি – ২, বাদুড়িয়া, রাজারহাট, বনগাঁ, স্বরূপনগর, আমডাঙ্গা, বাগদা, হাড়োয়া, হাসনাবাদ। ৮) দক্ষিণ 24 পরগনার বারাইপুর, সোনারপুর, ভাঙ্গড় – ১,২, বজবজ – ২, মগরাহাট – ২, বিষ্ণুপুর – ২, জয়নগর – ১। ৯) কলকাতার দক্ষিণভাগ এর যাদবপুর, টালিগঞ্জ, বেহালা প্রভৃতি অঞ্চল।

বর্তমানে এই ভাবেই আর্সেনিক ছড়িয়ে পড়ছে নিঃশব্দে। বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে নলকূপ। তাই এখনই আর্সেনিক দূষণ বন্ধ করার ব্যবস্থা না করলে এই দূষণই আমাদের একদিন গ্রাস করে নেবে।

উপসংহার

বাংলাদেশ আর্সেনিক দূষণের সমস্যা দু কোটি ছাড়িয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় কুড়ি লক্ষ মানুষ এই দূষণের শিকার। ইউনিসেফের জল নিকাশি ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিভাগের পরিসংখ্যান তাই বলে। প্রসূতিদের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে পৌঁছে যাচ্ছে আর্সেনিক। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের সচেতন, প্রকৃতিপ্রেমি ও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে মোকাবিলা করতে হবে।

Show Your Love
Print Friendly, PDF & Email

Related Posts

Facebook
WhatsApp
Twitter
Email
Telegram
Scroll to Top