বাংলার উৎসব (Festival of Bengal)

“প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দিন একাকী কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ভূমিকা

বিচ্ছিন্নতা মানব জীবনের পক্ষে দুঃসহ, মিলনেই মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ সার্থকতা। আদিম জীবনেও মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনযাপন করত। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মিলনে গড়ে ওঠে সমাজ পারস্পরিক মেলামেশায় সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া সামাজিক জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। হৃদয়বান মননজীবি মানুষ তাই একা থাকতে পারে না। নিজের আনন্দকে সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেয়, উপভোগ করে । এই আনন্দ গুলির নাম উৎসব । উৎসব তাই মিলনের সুখ প্রাণের আনন্দের অভিব্যক্তি।

উৎসবের তাৎপর্য

শুধু দিনযাপনের শুধুপ্রাণ ধারণের দিনানুদৈনিক গ্লানি থেকে মানুষের মুক্তির অবসর আনে উৎসবের মুহূর্ত । উৎসবের পরিবেশে মানুষ তার নিজ সত্তার যথার্থ পরিচয় লাভ করে ধন্য হয় । তাই মানব জীবনে উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রত্যাহিক জীবনে গতানুগতিকতার প্রতিটি মানুষই স্বতন্ত্র। বিশ্বের প্রতিটি জাতির মানুষই তাদের নিজ নিজ দিনগুলিকে সৃষ্টি করে নিয়েছে। বাঙালির ক্ষেত্রেও তাই এর ব্যাতিক্রম হয়নি।

উৎসবের শ্রেণীবিভাগ

কথায় বলে আমাদের এই বাংলায় বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। কথাটা কিন্তু মোটেই মিথ্যা নয়। সমগ্র ভারতবর্ষে তো বটেই, সারা বিশ্বেও এমন উৎসব প্রবন স্থান আর দুটো খুঁজে পাওয়া যাবে না ।বাংলার উৎসব গুলিকে বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বিচার করলে একে কয়েকটা শ্রেণীতে ভাগ করা যায় । কয়েকটা বিশেষভাবেই ধর্মীয় , যেমন দুর্গাপুজো ,কালীপুজো , ঈদ ,মহরম ,ইত্যাদি। আবার কয়েকটা বিশেষভাবেই সাময়িক, যেমন নববর্ষ বা বর্ষামঙ্গল। লৌকিক উৎসবের মধ্যে পড়ে নবান্ন ও পৌষ পার্বণ। ২৫ শে বৈশাখ ,১৫ ই আগস্ট, তেইশে জানুয়ারি, আজও বাঙালির কাছে বিশেষ উৎসব হিসাবে সামাজিক উৎসব বলা যায়। কেননা উৎসবের ধর্ম অনুযায়ী সবগুলিতেই ব্যক্তি মানুষ সামাজিক মিলনের মধ্যে নিজের ক্ষুদ্র সীমা বিসর্জন দিয়ে বিরাটের বিরটত্ত অনুভব করে ।

গ্রীষ্মের উৎসব

বৈশাখ মাস থেকে বাংলা বছরের শুরু । এ মাসের প্রথম দিনটি কে তাই নববর্ষ বরণ উৎসব গণ্য করা হয়ে থাকে বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের কাছে এই দিনটি নতুন খাতা বা হালখাতার দিন রূপে চিহ্নিত হয়ে থাকে । সমস্ত উৎসবের মতো এই উৎসবেও নববর্ষ প্রতিদান নব বস্ত্র পরিধান ও সুখাদ্য ভোজনের একটি অলিখিত নিয়ম বিধি মেনে চলা হয়। সংগীতে, নিত্যে, আবৃত্তিতে, নানা অনুষ্ঠানে এই দিনটিকে স্মরণ করে বাঙালি তার সাংবাৎসরিক উৎসবের সূচনা করে। এই বৈশাখ মাসের ২৫ তারিখ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। এই দিনটি ও বাঙালির একটি জাতীয় উৎসবের দিন । নানা সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানের আলোচনা ,বক্তিতা, গান, অভিনয় প্রভৃতির মাধ্যমে এই দিনটিতে বাঙালি কবি গুরুকে তার হৃদয়ের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে। ছোট-বড় নির্বিশেষে সকলেই এই দিনটি পালনে যথাসাধ্য ব্রতি হয় ।

বর্ষার উৎসব

আষাঢ় মাসে বর্ষা বরণের উৎসবটি গ্রামবাংলার একটি দীর্ঘকাল প্রচলিত লৌকিক উৎসব হলেও কবিগুরু বর্ষামঙ্গলে তার একটি অভিনবরূপ স্থাপন করেছেন । এই উৎসব প্রধানত শহরে পালিত হয়ে থাকে। কৃষিপ্রধান সভ্যতার পক্ষে এটির তাৎপর্য সুদুরপ্রসারী । শ্রাবণ মাসে আসে আরেকটি জাতীয়। উৎসব ১৫ই আগস্ট । দীর্ঘ ২০০ বছরের পরাধীনতার শিকল ছিঁড়ে স্বাধিকার লাভের এই দিনটি আমাদের কাছে একটি প্রধান জাতীয় উৎসব হিসাবেই গণ্য হয়ে থাকে। কুচকাওয়াজ, প্রভাতফেরী, ও নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে এই দিনটি পালিত হয়ে থাকে।

শরতের উৎসব

শরৎকাল বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব এর কাল ।এই সময় শারদীয়া দুর্গাপূজা ,কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা, কালীপূজার উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। চারদিনব্যাপী দুর্গাপুজো বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। উৎসব প্রিয় বাঙালি যেন সারা বছর ধরে এই শুভ লগ্ন টির জন্য অপেক্ষা করে থাকে । নতুন পোশাকে সকলের সুসজ্জিত হয়। প্রবাসী গৃহে ফেরে । মিলনের আনন্দ বাঙালির সমগ্র জাতীয় মনটি ভরে ওঠে । পূজায় বিজয়দশমী দিনটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা কে ছাড়িয়ে সামাজিক মহামিলনের সুদুরপ্রসারি তাৎপর্য লাভ করে উৎসবে যথার্থ স্বরূপ টিকে যেন ঝুলিয়ে দেয়। শারদীয়া পূর্ণিমায় কোজাগরী লক্ষ্মীপূজো অনুষ্ঠিত হয় । এটি অখন্ড বাংলায় পূর্ববঙ্গের সর্বাপেক্ষা বড় উৎসব ছিল। জ্যোৎস্না প্লাবিত রাত্রিতে পূজা ও রাত্রি জাগরন এই উৎসবটি কে বিচিত্র আনন্দরসে ভরে দেয় । এরপর এ আসে শ্যামাপূজা। অমাবস্যা নিরন্ধ ,অন্ধকার বিদীর্ণ করে আতশবাজি আকাশে ওঠে মুহূর্ত, চতুর্দিক আলোকিত করে দেয়। প্রতিটি গৃহ, দীপমালা সুসজ্জিত হয়ে ওঠে ।এই সমস্ত পূজাকে কেন্দ্র করে যাত্রা, জলসা , থিয়েটার, প্রভৃতি নানাবিধ সম্মিলনীতে যোগদান করে থাকে।

হেমন্ত শীত ও বসন্তের উৎসব

কৃষিনির্ভর গ্রাম বাংলায় অঘ্রাণয় মাসে নবান্ন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। কৃষকের গোলায় ওঠা নতুন ধান তার মুখে হাসি ফোটায় আর নবান্নের উৎসবে, সেই হাসি চতুর্দিকে পরিব্যপ্ত হয়ে পড়ে। পৌষ সংক্রান্তিতে পৌষ পার্বণের উৎসব ও এমনি একটি গ্রামকেন্দ্রিক উৎসব। ঘরে ঘরে তখন পিঠা-পায়েসের আয়োজন করা হয় । ফসলের প্রাচুর্য , উৎসবের মাধুর্যে বাংলার পল্লী জীবনকে যথার্থ লক্ষ্মীশ্রী মন্ডিত করে তোলে । মাঘ মাসে হয় সরস্বতী পূজা। বিদ্যাদেবী সরস্বতীর আরাধনায় ছোটোরাই প্রধান ভূমিকা নেয় বটে, তবে এটিও একটি সার্বজনীন উৎসব ।এই মাসেই তেইশে জানুয়ারি নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের জন্মদিন বাঙালির আর একটি জাতীয় উৎসব ।নানা অনুষ্ঠানে সমবেত হয়ে বাঙালি এই দিনটি তে নেতাজির প্রতি প্রণাম জানায় । বসন্তকালের শ্রেষ্ঠ উৎসব সংঘটিত হয় দোল পূর্ণিমায়। এটাকেই বাঙালির বাৎসরিক জীবনের শেষ উৎসব বলা যায় । রঙে ও উল্লাসে এই উৎসব মুখর । সমস্ত মানুষের হৃদয়ের অনুরাগে এই উৎসবটি রঙিন হয়ে ওঠে ।

কল্যাণী ইচ্ছাই উৎসবের প্রাণ

“বাঙালি ঘরকুনে” এ অপবাদ আমাদের সকলেরই জানা কিন্তু তাই বলে বাঙালি কখনই আত্মকেন্দ্রিক নয়। আত্মকেন্দ্রিক মানে আপনাতে আপনি বদ্ধ।কিন্তু বাঙালি যদি আপনাতে আপনি বদ্ধ হতো তাহলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ হতনা। আমার আনন্দে সকলের আনন্দ হোক,আমার আনন্দ আরো পাঁচ জন উপভোগ করুক – এই কল্যাণী ইচ্ছাই হলো উৎসবের প্রাণ।সকল বাঙালির মনে এই ইচ্ছে আছে বলেইসবাই মিলেমিশে উৎসবে মেতে উঠে।

উপসংহার

শুধুমাত্র স্বজাতি ও স্বধর্মের উৎসবই নয়, বাঙালি তার সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে অন্যধর্ম ও জাতির উৎসবে সমভাবে অংশগ্রহণ করে। খ্রিস্টান, মুসলমান ও হিন্দুদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাগ্রহে যোগ দেয়। আবার হিন্দুরাও মুসলমানের ঈদ কিংবা মহরম অথবা খ্রিস্টানদের পবিত্র যিশুখ্রিস্টের জন্মদিনে সমভাবে যোগ দেয় । দুরকে কাছে আনা পরকে আপন করার মধ্যে যে চরিতার্থতা উৎসব প্রিয় বাঙালির ১২ মাসের তেরো পার্বণের মধ্য দিয়ে বাংলার জাতীয় ঐতিহ্য ধরা পড়েছে।

Related Posts

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Facebook
WhatsApp
Twitter
Email
Telegram
error: Content is protected !!
Scroll to Top