কন্যাশ্রী প্রকল্প

কন্যাশ্রী প্রকল্প

ভূমিকা

‘বিশ্বে যা -কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার সৃজিয়াছে নারী- অর্ধেক তার নর।’

– নজরুল ইসলাম

নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে সংসার। শুধু সংসারও নয়, গড়ে ওঠে নব নব সৃষ্টি, সৃষ্টির উন্মাদনা,বীজ, গড়ে ওঠে ভবিষ্যতের অঙ্কুর। তবুও যোগ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত থাকে নারী। যেন ‘দোহন’ করে কেবল ‘দুহিতা’ নামের সার্থকতা ফুটিয়ে তুলছে জীবন দিয়ে। প্রদীপের নিচে সেই গাঢ় অন্ধকার, সেই নিগূঢ় কালিমা টুকু মুছে দেওয়ার এক অনন্য প্রয়াসের নাম -ই ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প’। কন্যা-র সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকা কিছু বিশেষণ ভাগ্যবিড়ম্বিতা, উপেক্ষিতা, লাঞ্ছিতা – এই সব অবলুপ্ত করার এক প্রচেষ্টার নামই ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প’ ।

কন্যাশ্রী প্রকল্প কি?

‘কন্যাশ্রী প্রকল্প‘এমন একটি প্রকল্পই যেখানে মেয়েদের শিক্ষা ও শিক্ষা বিস্তারের জন্য সরকারের তরফ থেকে একটি আর্থসামাজিক অবলম্বন দিয়ে তাদের মানসিকভাবে দৃঢ় করে তোলা হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনকল্যাণকর প্রকল্প হল এই প্রকল্প।

কাদের জন্য ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প’

পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প’ ঘোষণা করেন। এর আগে এই প্রকল্প ছিল না। যাদের জন্য এই প্রকল্প – (১) যাদের বার্ষিক আয় এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকার নিচে সেইসব পরিবারের কন্যা -সন্তানরা।(২) উপরিউক্ত পরিবারের কন্যাসন্তানরা ১৩-১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বার্ষিক ৫০০ টাকা করে পাবে।(৩) এই পরিবারের ১৮-১৯ বছরের মধ্যে অবিবাহিত কন্যারা পাবে বার্ষিক ২৫ হাজার টাকা।

প্রকল্পের রেখাচিত্র

শর্তসাপেক্ষ নগদ হস্তান্তর প্রকল্প পৃথিবীর বহু দেশে শিশু ও বয়:সন্ধি বয়সীদের জীবনধারার মানোন্নয়ন ঘটাতে সমর্থ হয়েছে| এই বহুল স্বীকৃত সাফল্যকে সামনে রেখে কন্যাশ্রী প্রকল্প শর্তাধীন নগদ হস্তান্তরের মাধ্যমে কন্যাশিশুর বিদ্যালয় ভিত্তিক পঠনপাঠন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়া ও অন্তত ১৮ বছরের আগে বিবাহ না হওয়াকে সুনিশ্চিত করতে চায়। এই শর্তাধীন নগদ হস্তান্তর দুটি ভাগে করা হয়:

প্রথমটি হলো বার্ষিক ৭৫০ টাকা বৃত্তি : এটি পাবার যোগ্যতা নির্ণায়ক শর্তগুলি হলো-

(ক) ছাত্রীর বয়স তেরো বছরের বেশি ও আঠেরো বছরের কম হতে হবে;
(খ) ছাত্রীকে অন্তত অষ্টম শ্রেণীতে পাঠরতা হতে হবে;
(গ) ছাত্রীর পারিবারিক আয় বাৎসরিক অনধিক এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা হতে হবে;
(ঘ) ছাত্রীকে অবিবাহিতা হতে হবে।

দ্বিতীয়টি হলো এক কালীন ২৫০০০ টাকা বৃত্তি : এটি পাবার যোগ্যতা নির্ণায়ক শর্তগুলি হলো-

(ক) আবেদন করার দিনে ছাত্রীর বয়স আঠেরো বছরের বেশি ও উনিশ বছরের কম হতে হবে;
(খ) ছাত্রীকে মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক, কারিগরি, বৃত্তিমূলক, ক্রীড়াবিষয়ক ইত্যাদি যে কোনো বিষয়ে নিবন্ধীকৃত প্রতিষ্ঠানের পাঠরত হতে হবে।

এছাড়াও প্রথম বৃত্তি পাবার অন্যান্য শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে।
কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে বৃত্তির যোগ্যতা নির্ণায়ক শর্তগুলি প্রয়োজন অনুযায়ী শিথিল করা হয়।
(১) বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু, বিচারাধীন আবাসিক কিশোরী ও অনাথ শিশু কন্যার ক্ষেত্রে পারিবারিক আয়ের কোনো উর্দ্ধসীমা নেই।
(২) বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুরা তেরো বছর বয়স হবার পরই, অষ্টম মানের থেকে নিচু শ্রেণীতে পাঠরতা হলেও অন্যান্য শর্তগুলি পূরণ হলে কন্যাশ্রীর এই অনুদানগুলির জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

কন‍্যাশ্রী প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা

সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে বীজবপন, কৃষিকাজ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নারী তার বােধ, রুচি, শিক্ষা, বুদ্ধি দিয়ে প্রতিনিয়ত সমাজের অগ্রগতিতে নিজেকে আহুতি দিয়ে চলেছে। অথচ নারীর অধিকার, মর্যাদা, প্রতিষ্ঠা এখনও পুরুষশাসিত সমাজে স্বপ্নই। এখনও পর্দার আড়ালে তাকে লুকিয়ে রাখার অক্ষম প্রচেষ্টা চলে নিরন্তর। কন্যাসন্তান পিতামাতার কাছে এখনও বােঝা।‘গৌরীদান’-এর মতাে অভিশপ্ত প্রথা ভারতের তথা পশ্চিমবঙ্গের পিছিয়ে-পড়া গ্রামগুলিত আজও বিরল নয়। দারিদ্র্য, অপুষ্টি, অশিক্ষা আর কু-সংস্কারের অন্ধকার থেকে মেয়েদের আলােয় নিয়ে আসার প্রচেষ্টার নাম কন্যাশ্রী প্রকল্প।

এর মধ্যেই ১৮ লক্ষ ছাত্রী এই বার্ষিক বৃত্তি এবং প্রায় ৩.৫ লক্ষ্য ছাত্রী এককালীন বৃত্তি পেয়েছে। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে বীজ বপন, কৃষি কাজ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নারী তার বোধ, রুচি, শিক্ষা, বুদ্ধি দিয়ে প্রতিনিয়ত সমাজের অগ্রগতিতে আহুতি দিয়ে চলেছে অথচ যোগ্য অধিকার, মর্যাদা, প্রতিষ্ঠা এখন ও পুরুষশাসিত সমাজে স্বপ্নই। এখন ও পর্দার আড়ালে তাকে লুকিয়ে রাখার অক্ষম প্রচেষ্টা চলে নিরন্তর।কন‍্যাসন্তান পিতা-মাতার কাছে এখনও বোঝা, ‘গৌরিদান’- এর মতো অভিশপ্ত প্রথা গ্রাম-গঞ্জে বিরল নয়। দারিদ্র্য, অপুষ্টি, বঞ্চনা থেকে বাঁচানোর অন্যতম ও অনন্য এই প্রচেষ্টার নাম ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প’ এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রকার। ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প’, ‘বাল্যবিবাহ’- এই কুপ্রথা দূরীকরণের অন্যতম সহায়ক শর্ত।

কন্যাশ্রী প্রকল্পের উদ্দেশ্য

শিক্ষার পরিবেশে থাকাকালীন মানুষের দক্ষতা ও জ্ঞানের পরিধির নিরন্তর বিকাশ ঘটে এবং কালক্রমে তা আর্থিক উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতার পথ প্রশস্ত করে। অন্তত ১৮ বছরের বয়সের পর বিবাহিতা জীবনে কন্যাসন্তান প্রবেশ করলে, তা তার পরিণত জীবনের সুঠাম ভিত্তি রচনা করতে পারে। প্রতিটি কন্যাসন্তানের উপযুক্ত বয়স হবার পর বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করা সুনিশ্চিত হলে, একদিকে যেমন বাল্যবিবাহের কুসংস্কার থেকে সমাজ মুক্ত হতে পারবে, অন্যদিকে তেমন নারীর সুস্বাস্থ্য , শিক্ষা, আর্থ- সামাজিক মর্যাদা ও সর্বোপরি আর্থিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে।

নারী সমাজকে পাদপ্রদীপের আলোয় আনার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের প্রয়াস অব্যাহত ছিল। সর্বশিক্ষা মিশনের দৌলতে মেয়েদের পড়াশোনার ক্ষেত্রটি প্রশস্ত ও আলোকিত হলে আর্থিক সংকট ছিল বাধার প্রধান সূত্র। যার সমাধান হল ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প’। তাই এই প্রকল্প বাংলার পিছিয়ে পড়া মেয়েদের সামনে এক নতুন দিগন্তের ঠিকানা।

কন্যাশ্রী প্রকল্পের সাফল্য

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, বীরভূম, মালদহ প্রভৃতি জেলায় এখনো লেগে রয়েছে বাল্যবিবাহের কলঙ্কের দাগ।এখানে শতকরা ৫৮ ভাগ মেয়েদের ১৮ বছরের কম বয়সে এখনও বিবাহ হয়ে যায়। বর্তমানে কন্যাশ্রী প্রকল্প তা রোধে অনেকখানি সফল।। জেলাশাসক, পঞ্চায়েত সমিতি, গ্রাম পঞ্চায়েতের তৎপরতায় কন্যাশ্রী প্রকল্পের সুষ্ঠু রুপায়ন সম্ভব হয়েছে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী ১৫.৫২ লক্ষ মেয়ে বার্ষিক বৃত্তি এবং ১.৩ লক্ষ মেয়ে এককালীন বৃত্তি লাভ করেছে। তাই বলা যায় এই প্রকল্পটি মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথে বলিষ্ঠ এক পদক্ষেপ।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

‘ আমার সকল ব্যথা রঙিন হয়ে গোলাপ হয়ে উঠবে’।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুদিনের সঞ্চিত ব্যথা, অবহেলা, অশ্রদ্ধা, বঞ্চনার দীর্ঘ নদীটির সুখের সাগরে মিলিত হওয়ার দিন আসন্ন। কন্যাশ্রী প্রকল্প সমগ্র বিশ্বের নারীপ্রগতির নতুন দিশা। গত ২৩ জুন (২০১৭) বিশ্ব জনপরিষেবা দিবসে নেদারল্যান্ডসে আয়ােজিত রাষ্ট্রসংঘের অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হল বাংলার কন্যাশ্রী-কে। জনপরিষেবায় সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে কন্যাশ্রী প্রকল্প। রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কন্যাশ্রী প্রকল্পের জন্য রাষ্ট্রসংঘের প্রথম পুরস্কার গ্রহণ করেন। নিরলস অংশগ্রহণ এবং প্রচেষ্টার মাধ্যমে কীভাবে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে তাঁদের কষ্ট লাঘব করা যায়, এই প্রেক্ষিতে কন্যাশ্রী প্রকল্প সারা বিশ্বের দেশনেতাদের সমীহ আদায় করে নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, কন্যাশ্রীর এই স্বীকৃতি বাংলার প্রতিটি মেয়ের কাছে গর্ব। কন্যাভ্ৰূণ হত্যা, কন্যাসন্তানকে অবাঞ্চিত মনে করা, এসব থেকে মুক্ত হয়ে, পরিবারের মেয়েদের জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের প্রয়ােজন।

উপসংহার

বহুদিনের সঞ্চিত ব্যথা, অবহেলা, অশ্রদ্ধা, বঞ্চনার দীর্ঘ নদীটির সুখের সাগরে মিলিত হওয়ার দিন আসন্ন। ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প’ সমগ্র বিশ্বের নারী প্রগতির নতুন দিশা। কন্যাভ্রূণ হত্যা, কন্যা সন্তানকে অবাঞ্চিত মনে করা, এইসব থেকে মুক্ত হয়ে, তাদের জন্য প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের। শিক্ষাই মনের অন্ধকার দূর করতে পারে। বহু যুগের অন্ধ অচলায়তন, মিথ্যে দুর্গ ভেঙে বহু নারী তাদের সোনার পদচিহ্ন রেখে গেছেন ইতিহাসের দরজায়। নারীকে ‘আপন ভাগ্য জয় করিবার’ অধিকার দিতে হবে। ভবিষ্যতের নিরাপত্তার, অর্থনৈতিক ভিত্তির বিশ্বাস এই ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প’ দেশ ও জাতিকে প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ করে তুলবে। তাই আমরা এই প্রকল্পের সাফল্য কামনা করি এবং তার সঙ্গে আমাদের মনকে দীনতা মুক্ত করে নারী ও পুরুষকে একই বিহঙ্গের দুই ডানারূপে মনেও মনকে মেনে নিতে শিখি জীবনের প্রতি ক্ষণে।

Related Posts

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Facebook
WhatsApp
Twitter
Email
Telegram
error: Content is protected !!
Scroll to Top